জীবন দর্শন ভ্রমন স্বাস্থ্য ইতিহাস অনুপ্রেরণা চাকরি জানা-অজানা বিশেষ প্রতিবেদন সাক্ষাৎকার

হোয়াইট কলার ক্রাইম: অপরাধের এক নতুন মাত্রা

0


সালমান সাদাত
ক্রিমিনোলোজি এন্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়:

বর্তমান সময়ে হোয়াইট কলার ক্রাইম সমাজে বিস্তৃত এক অপরাধের নাম। এই অপরাধে জড়িত অপরাধীর সংখ্যা সমাজে ব্যাপক এবং দিন দিন এই সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমাদের দেশ ও জাতি পিছিয়ে পরছে। হোয়াইট কলার ক্রাইম এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে অপরাধ বিজ্ঞানী সাদারল্যান্ড বলেছেন, “হোয়াইট কলার ক্রাইম হলো সেই সকল অপরাধ যা একজন ব্যাক্তি সমাজে বা কর্মস্থলের উচ্চ মর্যাদাশীল অবস্থানে থাকা অবস্থায় শুধুমাত্র নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য করে থাকে।“

অর্থাৎ একজন ব্যক্তি যখন তার নিজ কর্মস্থলে অথবা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোন অপরাধ মূলক কাজ করে তাকে হোয়াইট কলার ক্রাইম বলে। যেমনঃ ঘুষ গ্রহনের মাধ্যমে কোন কাজ সম্পন্ন করা একটি হোয়াইট কলার ক্রাইমের অন্তর্ভূক্ত। এখানে একজন ব্যক্তি তার পদমর্যাদার অপব্যবহার করেন। অপরাধ বিজ্ঞানীদের মধ্যে সর্বপ্রথম এডউইন সাদরল্যান্ড ১৯৪১ সালে হোয়াইট কলার ক্রাইমের ধারনা সামনে আনেন। তিনি দেখতে পান পুজিবাদী সমাজে উচ্চ পর্যায়ে অবস্থানকারী মানুষেরা সমাজের নিন্ম শ্রেনীর মানুষদের শোষনের জন্য তাদের পদমর্যাদার অপব্যবহার করে, ব্যপক সংখ্যক মানুষকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে থাকে। যেহেতু সেই উচ্চ মর্যাদার মানুষেরা সমাজে প্রভাবশালী ও মর্যাদাশীল অবস্থানে অধিষ্টিত তাই তাদের দ্বারা কৃত এই অপরাধ গুলোকে তিনি নাম দেন হোয়াইট কলার ক্রাইম।

আমাদের দেশে এই ধরনের অপরাধ দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর কারন হিসেবে কয়েকটি কারনকে চিহিৃত করা যায়। আসলে এই অপরাধটি ব্রিটিশদের সময় থেকেই ব্যপক ভাবে চর্চা হয়ে আসছে এই দেশে। এর প্রধান কারন ছিল শাসক গোষ্ঠীর প্রনীত দমন পীড়ন ও বৈষম্যমূলক আইন। এছাড়া আরো কিছু কারনের মধ্যে ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সামাজিক অনিশ্চয়তা, জীবনের অনিরাপত্তা জনিত নানা সমস্যা। তবে বর্তমান সময়ে যে কারনটি এই অপরাধের জন্য দায়ী হিসেবে ধরা হয় তা হল শ্রেনীবৈষম্য। অর্থ যেখানে শ্রেনী বা সমাজের অবস্থান নির্ধারণ করার মাপকাঠি, সেখানে অর্থ উপার্জনই হয় মানুষের একমাত্র লক্ষ্য, হোক তা বৈধ পথে কিংবা অবৈধ পথে।

হোয়াইট কলার ক্রাইমের কারনে দেশে নানা রকম অপরাধের বীজ বপন হচ্ছে ও ব্যপক মানুষ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে এর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। যেমনঃ ব্যাংক ফ্রড, বীমা জালিয়াতি, ব্লাক মেইল, ঘুষ ও ক্রেডিট কার্ড ফ্রড ইত্যাদি হলো ব্যাংকিং খাতের অপরাধ, যা হলো হোয়াইট কলার ক্রাইমের অন্তর্ভুক্ত। সম্প্রতি কিছু বছর আগে আমরা হলমার্ক কেলেঙ্কারী সম্পর্কে মিডিয়ায় অনেক আলোচনা শুনেছি। ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে এই কোম্পানীটি রাষ্ট্রীয় একটি ব্যাংক থেকে প্রায় ৩হাজার ৪শত কোটি টাকা লোপাট করেছে। তারা এটা পেরেছে কিছু অর্থলোভী ব্যাংক কর্মকর্তার সহায়তায়, যাদের পরে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিলো। এরকম আরো অনেক ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনা হরহামেশাই আমরা পত্র-পত্রিকায় দেখতে পাই। কারন হরহামেশাই ব্যাংক কর্মকর্তারা অর্থের লোভে তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে বহু মানুষকে প্রতারিত করছে তাদের অগোচরেই। কিন্তু বেশীর ভাগ সময়ই অপরাধীরা থেকে যায় আইনের ধরা ছোয়ার বাইরে। কারন সমাজে তাদের বিদ্যমান প্রভাবশালী এবং মর্যাদাশীল অবস্থান।

হোয়াইট কলার ক্রাইম ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি অন্য খাতেও হয়ে থাকে। যেমনঃ চিকিৎসা, প্রকৌশলী অথবা প্রশাসনিক খাতেও এই অপরাধ লক্ষ্যনীয়। এমনকি শিক্ষার মত পবিত্র জায়গায় ও এই অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে বর্তমানে সময়ে, যা খুবই আতঙ্ক জনক।

কোন সমাজ অথবা কোন কর্মস্থলের উচ্চ মর্যাদার মানুষদের অপরাধের সুযোগ বেশী থাকে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা অবৈধ পথে আয় করে নেয় প্রচুর অর্থ। একজন ডাক্তার সে সুযোগ পায় বলেই রোগীর সাথে প্রতারণা করতে পারে। কারন রোগীর ডাক্তারী জ্ঞান নেই।

অপরদিকে যারা এই অপরাধের সাথে যুক্ত থাকে তারা অনেক কৌশলী ও বুদ্ধিমান হয়ে থাকে। তাদের বুদ্ধিমত্তা ও নতুন নতুন কৌশলের অপরাধের কারনে অনেক সময় তাদের সনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

এই ধরনের অপরাধকে প্রতিরোধ করতে হলে প্রথমেই মানুষের মধ্যে গণসচেতনতা এবং শিক্ষার প্রসার করতে হবে। ধর্মীয় মুল্যবোধ বৃদ্ধি করতে হবে যেনো কেউ এরুপ অপকর্মের প্রতি আগ্রহ করতে না পারে। গণসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সবাইকে এই অপরাধ, এর দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতি এবং তার প্রতিকার সম্পর্কে জানাতে হবে যেনো তারা প্রতিটি অবস্থানেই এই অপরাধকে প্রতিরোধ করতে পারে।

বর্তমানে সরকার এই ধরনের ঘৃন্য অপরাধকে মোকাবেলার জন্য অনেক পরিকল্পনা গ্রহন করেছে। আছে দুর্নীতি দমন কমিশন। সকল ব্যাংক ও প্রাশাসনিক দপ্তরে লাগনো হয়েছে নজদারী ক্যামেরা। এখন, জনগণ সচেষ্ট হলে, সবাই মিলে এক সাথে এরুপ অপরাধ দমন করা সম্ভব এবং দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়া সম্ভব।

ফেইসবুক মন্তব্য

Leave A Reply