জীবন দর্শন ভ্রমন স্বাস্থ্য ইতিহাস অনুপ্রেরণা চাকরি জানা-অজানা বিশেষ প্রতিবেদন সাক্ষাৎকার

মুসলিম ঐতিহ্যের উজ্জল নিদর্শন মান্দার ঐতিহাসিক কুসুম্বা মসজিদ

0


সুলতান আহমেদ
নওগাঁ প্রতিনিধিঃ

পৃথিবীতে এমন কিছু বস্তু রয়েছে যা মানুষকে অবাক করে দেয়। এমনই এক গৌরবোজ্জল অতীতের স্বাক্ষী হয়ে ৪শ ৬০ বছরের ঐতিহ্য ধারন করে দাঁড়িয়ে আছে নওগাঁর মান্দা উপজেলার ঐতিহাসিক কুসুম্বা মসজিদ। বাংলাদেশের পাঁচ টাকার নোটে মুদ্রিত মসজিদের ছবিটি নওগাঁর (মান্দার) ঐতিহাসিক কুসুম্বা মসজিদের। ৪শ ৬০ বছরের প্রাচীন পাথরের নির্মিত মসজিদটি ৬ গম্বুজ বিশিষ্ট। নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলায় নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়কের পশ্চিম দিকে ৪০০ মিটার উত্তরে কুসুম্বা মসজিদটি অবস্থিত। প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী আসেন এই মসজিদটি দেখার জন্য।

কুসুম্বা মসজিদটি সুলতানি আমলের একটি পুরাকীর্তি। যা নওগাঁ জেলার ইতিহাস ও মুসলিম ঐতিহ্যের উজ্জল নিদর্শন। মসজিদটি দেখতে অনেকটা আমাদের দেশের চালা ঘরের মতো উত্তর-দক্ষিণে কিছুটা বক্র। মসজিদ সংলগ্ন উত্তর-দক্ষিণ দিকে রয়েছে ৭৭.২৫ বিঘা বিশিষ্ট একটি বিশাল দিঘি। দিঘিটি লম্বায় প্রায় ১২০০ ফুট ও চওড়ায় প্রায় ৯০০ ফুট। গ্রামবাসী এবং মুসল্লিদের খাবার পানি, গোসল ও অযুর প্রয়োজন মেটানোর জন্য এই দিঘিটি খনন করা হয়েছিল। এই দিঘির পাড়েই নির্মাণ করা হয়েছে ঐতিহাসিক কুসুম্বা মসজিদ।

কুসুম্বা মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে ৫৮ফুট লম্বা, ৪২ ফুট চওড়ায়। চারদিকের দেওয়াল ৬ ফুট পুরু। তার উপর বাইরের অংশ পাথর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। মসজিদের সম্মুখ ভাগে রয়েছে ৩টি দরজা। আকারে ২টি বড়, অন্যটি অপেক্ষাকৃত ছোট। দরজাগুলো খিলানযুক্ত মেহরাব আকৃতির। মসজিদের চার কোনায় রয়েছে ৪টি মিনার। মিনারগুলো মসজিদের দেওয়াল পর্যন্ত উঁচু ও আট কোনাকার। ছাদের ওপর রয়েছে মোট ৬টি গুম্বুজ। যা দুইটি সারিতে তৈরি।

দ্বিতীয় সারির গম্বুজগুলো আকৃতির দিক দিয়ে ছোট। মসজিদের ভেতর ২টি পিলার রয়েছে। উত্তর দিকের মেহরাবের সামনে পাথরের পিলারের ওপর তৈরি করা হয়েছিল একটি দোতলা ঘর। এই ঘরটিকে বলা হতো জেনান গ্যালারি বা মহিলাদের নামাজের ঘর। মসজিদের ভেতর পশ্চিমের দেয়ালে রয়েছে ৩টি চমৎকার মেহরাবের ওপর ঝুলন্ত শিকল, ফুল ও লতা-পাতার কারুকাজ করা। এ কারুকার্য গুলো দেখলেই বোঝা যায় যে, তা কত উন্নত মানের। দক্ষিণ দিকের মেহরাব ২টি আকারে বড়। উত্তর দিকের মেহরাবটি ছোট। মসজিদটির উত্তর-দক্ষিণ দিকে দুটি করে দরজা ছিল।

মসজিদের সম্মুখভাগে রয়েছে খোলা প্রাঙ্গন যা নামাজের জন্যও ব্যবহৃত হয়। এর ঠিক পরেই পাথর বসানো সিঁড়ি যা গিয়ে নেমেছে দিঘিতে। মসজিদের উত্তর পার্শ্বে রয়েছে একটি প্রকান্ড তেঁতুল গাছ। এছাড়া মসজিদের প্রবেশ পথের একটু দূরে বাক্স আকৃতির একখন্ড কালো পাথর দেখা যায়। অনেকে এটিকে কবর বলে মনে করেন।

জানা যায়, জনৈক কৃষক হাল চাষের সময় তার জমিতে পাথরটির সন্ধান পায়। সম্ভবত তার প্রচেষ্টায় পাথরটি পরে জমি থেকে তুলে এনে রাস্তার উত্তর পার্শ্বে রাখা হয়েছিল। এই পাথরের গায়ে তোগড়া হরফে আরবিতে লেখা রয়েছে, ‘আল মালেকু মা হুমম মোকারারামা আবুল মোজাফফর হোসেন শাহ বিন সৈয়দ আসরাফ আল হোসেন।‘ যার অর্থ ‘তিনি শাসক যিনি পরাক্রমশালী ও সম্মানের অধিকারী সৈয়দ আশরাফ আল হুসেনের পুত্র আবুল মোজাফফর হোসেন শাহ।’ এ থেকে বোঝা যায় প্রস্তর খন্ডটি হুসেন শাহের স্মৃতি বিজরিত।

যতদূর জানা যায় সবরখান বা সোলায়মান নামে ধর্মান্তরিত এক মুসলমান ব্যক্তি মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের দুটি শিলালিপির প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে মানুষের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। তবে মূল প্রবেশ পথের শিলালিপি থেকে প্রমাণিত হয় এই মসজিদটি ৯৬৬ হিজরী বা ১৫৫৮খ্রিষ্টব্দের। শের শাহের বংশধর আফগান সুলতান প্রথম গিয়াস উদ্দীন বাহাদুরের শাসনামলে (১৫৫৪-১৫৬০ সালে) নির্মিত।

মসজিদে ঘুরতে আসা মাহবুবুজ্জামান সেতু নামের একজন দর্শনার্থী বলেন, পাঁচ টাকার নোটের উপর ছবি দেখে অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল এখানে বেড়াতে আসার। বিপুল সম্ভবনা থাকার পরও প্রয়োজনীয় নজরদারির অভাবে নওগাঁর এই ঐতিহাসিক কুসুম্বা মসজিদ আকর্ষনীয় স্পট হিসাবে গড়ে উঠছে না।

এ ব্যাপারে মান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ রেজাউল করিম বলেন, কুসম্বা মসজিদটি নওগাঁর ঐতিহাসিক স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। মসজিদটি দেখার জন্য এখানে প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী আসেন। দর্শনার্থীদের সুযোগ-সুবিধার জন্য অযু ও গোসলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও দর্শনার্থীদের রান্না, বিশ্রামাগারসহ পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা রয়েছে। দর্শনার্থীদের আরও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য এরইমধ্যে পিকনিক স্পট ও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও মসজিদের চারপাশের সৌন্দর্য্য বাড়ানোর জন্য উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে।

ফেইসবুক মন্তব্য

Leave A Reply