জীবন দর্শন ভ্রমন স্বাস্থ্য ইতিহাস অনুপ্রেরণা চাকরি জানা-অজানা বিশেষ প্রতিবেদন সাক্ষাৎকার

মাদকাসক্ততার পরিবর্তিত ক্রমবিস্তারঃ রোধকল্পে করণীয়

0


মুক্তার আহমেদ
শিক্ষার্থী, ৩য় বর্ষ ২য় সেমিষ্টার
অপরাধত্ত্ব ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগ
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ফেনসিডিল এক সময়ে শীর্ষস্থান দখল করে থাকলেও বর্তমানে বাংলাদেশে ইয়াবা নামক মাদক পূর্বের সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। নিঃসন্দেহে বলা যায় বর্তামানে মাদকটির প্রধান ব্যবহারকারী তরুণ সমাজ। আধুনিক প্রযুক্তি এবং ইন্টারনেটের কল্যাণের মাধ্যমে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের বাজারজাতকরন সহজতর হয়েছে।

বাংলাদেশে ইয়াবা ট্যাবলেট প্রধানত এসে থাকে প্বার্শবর্তী দেশ মিয়ানমার থেকে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) গত চার বছরে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ৭৪৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করেছে কক্সবাজারের বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা থেকে। উত্তেজক এই মাদক ট্যাবলেট রাজধানী ঢাকা শহর থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিক্রি করছে মাদক ব্যবসায়ীরা।

মাদকের থাবায় দেশঃ

বাংলাদেশ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে গত দশ বছরে মাদক হিসেবে ইয়াবার ব্যবহার বেড়েছে শতকরা আটশ ভাগ বা আট গুণ। দেশে বর্তমানে ইয়াবার পরই দ্বিতীয় প্রধান মাদক হিসেবে ফেনসিডিল সেবন করা হচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে যে হারে ইয়াবার সেবন বাড়ছে সে অনুপাতে মাদক ফেনসিডিলের ব্যবহার কমছে। ফেনসিডিলে আসক্ত মাদকসেবীরাও দিনদিন দ্রুতগতিতে ঝুঁকে পড়ছেন ইয়াবা সেবনে।

তাছাড়া গাঁজা, হেরোইন, আফিম এবং বেশকিছু উত্তেজক ইনজেকশনের ব্যবহার আছে বাংলাদেশে। এসব মাদক পাচারের অন্যতম রুট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে বাংলাদেশ।

দেশে মাদক পাচারের উৎসঃ

বাংলাদেশে ফেনসিডিল সাধারনত এসে থাকে প্বার্শবর্তী দেশ ভারত থেকে। যা মাদক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমেও নিজ থেকে তৈরী করে থাকেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর প্রায় সময়ই এ সমস্ত মাদকদ্রব্য জব্দ করে থাকে।
অপরদিকে বাংলাদেশে ইয়াবা পাচার হয় প্রধানত মিয়ানমার থেকেই। বাংলাদেশ সীমানার ১০ কিলোমিটারের ভেতরে মিয়ানমারের মংডু অঞ্চলে ইয়াবার কারখানা আছে বলে জানা যায়। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে যে সমস্ত মাদক বহন করা হয় তার অধিকাংশই পরিবহণে কাজ করেন নিম্নবিত্তরা। যা মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তরা ব্যবহার করেন। সম্প্রতি স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী এবং নারীরাও ইয়াবা পাচার এবং গ্রহণে ধরা পড়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রভাবশালী লোকজন, শিল্পপতি, এবং কিছু অপরাজনৈতিক নেতারাও এই মাদক পাচারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষাভাবে জড়িত। তাছাড়া বিভিন্ন প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সহায়তায় ঢাকাসহ সারাদেশে দ্রুততর সময়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে ইয়াবা এবং অন্যান্য মাদকদ্রব্য।

যারা মাদক গ্রহণ করেনঃ

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন মাদকসেবীর সংখ্যা ৯০ লাখের কম নয়। তাদের বেশিরভাগই তরুণ, বয়সে ১৭ থেকে ৩৮ বছরের মধ্যে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের তথ্য থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে এখন ইয়াবাসেবী তরুণের সংখ্যা ৪০ লাখের কম নয়। চিকিৎসা নিতে যাওয়া মাদকসেবীর ৮০ ভাগই ইয়াবা আসক্ত। যারা বয়সে তরুণ এবং অপেক্ষাকৃত উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। বর্তমানে তরুণীরাও এই মাদক গ্রহণ করছেন। দিনদিন মাদকগ্রহণের ক্ষেত্রে তরুণীদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

করণীয় উদ্যোগসমূহঃ

বাংলাদেশে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য আসছে প্রধানত প্বার্শবর্তী দেশগুলোর সীমান্ত এলাকা থেকে। যা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে দ্রুততর সময়ে। মাদক পরিবহণের মূল হোতা কিংবা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীসহ অধিকাংশ শিশুদেরও। তাই অর্থের অভাবে থাকা এই নারী এবং শিশুরা সহজেই জড়িয়ে পড়ছে এ সমস্ত অপরাধ কর্মকান্ডে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর জানায়, শুধুমাত্র দেশেই অভিযান চালালে হবেনা। তাই মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ইয়াবা পাচার বন্ধে কূটনৈতিক মাধ্যমে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ অতীব জরুরি।

শুধু আইন প্রয়োগ করে মাদকের বিস্তার বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর অপব্যবহার বন্ধে পরিবার, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও ধর্মীয় নেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। মাদক প্রতিরোধে গণসচেতনতা তৈরির জন্য বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনকেও সোচ্চার হতে হবে।

মাদকাসক্তির যথার্থ কারন খুঁজে বের করা, এবং সেই সাথে বাংলাদেশ সরকারের উচিত একটি সঠিক তালিকা তৈরী করে নিরপেক্ষভাবে অভিযান শুরু করা। যে অভিযানে থাকবে সমাজের সকল স্তরের মানুষের সহযোগিতা। যে অভিযানে রেহাই পাবে না যে কোনো পর্যায়ের প্রকৃত মাদক চোরাচালানকারী। যার মাধ্যমে সুপ্রতিষ্ঠিত হবে বাংলাদেশ সরকারের প্রকৃত ভাবমূর্তি।

ফেইসবুক মন্তব্য

Leave A Reply