জীবন দর্শন ভ্রমন স্বাস্থ্য ইতিহাস অনুপ্রেরণা চাকরি জানা-অজানা বিশেষ প্রতিবেদন সাক্ষাৎকার

ঝালকাঠির শীতলপাটির শীতলতা

0


হাসান অারেফিন:

এমন একটা সময় ছিল যখন আমাদের গ্রাম বাংলায় কোন বাড়িতে অতিথি আসলে অতিথিকে বসতে পাটি দেয়া হতো। আর গৃহস্বামী বা গৃহকর্তাকে বসার জন্য ছিল বিশেষ ধরণের পাটি। বর্তমানে আমাদের দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়ের অন্যতম প্রয়োজনীয় সামগ্রী হচ্ছে শীতল পাটি। শীতল পাটি ছাড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়ের কথা চিন্তাই করা যায় না। গরমকালে বিশেষ করে চৈত্র মাস থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত শীতল পাটির কদর একটু বেড়েই যায়। যাদের বাড়িতে এয়ারকুলার বা এসি নেই তাদের বাড়িতে বিছানায় শীতল পাটি বিছালে নাকি এয়ারকুলারের চেয়েও বেশি শীতলতা পাওয়া যায়। অনেকে বলেন শীতলপাটিতে গাঁ এলিয়ে দিলে মনে হয় গ্রামের গোলপাতা বা টিনকাঠের ঘরে কাঁদালেপা মাটির মেঝেতে খালি গায়ে শুয়ে আছি। বাংলা সাহিত্যেও শীতলপাটির গুনকির্তণ করে বলা হয়েছে।

দেশের যে কয়েকটি জেলায় শীতলপাটি তৈরি করা হয় তার মধ্যে ঝালকাঠি অন্যতম। ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার হাইলাকাঠি ও ডহরশংকর গ্রামের ৮০টি হিন্দু পরিবার শীতলপাটি তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে। এছাড়া রাজাপুরের সদর, নলছিটির তিমিরকাঠি, কামদেবপুর, ঝালকাঠি শহরের কাশারিপট্টিতে হাতেগোনা কিছু কিছু বাড়িতে শীতলপাটি তৈরি হয়ে আসছে।
সবমিলিয়ে জেলায় প্রায় দেড়শতাধিক পরিবার এ পেশার ওপর নির্ভরশীল। ঝালকাঠিতে যখন রাষ্ট্র প্রধান বা সরকার প্রধান সফরে আসেন কিংবা কোন মন্ত্রী বা সরকারি বড় কোন কর্মকর্তা তখন তাকে ঝালকাঠিবাসীর পক্ষ থেকে শীতলপাটি উপহার হিসেবে দেয়া হয়।
এছাড়া প্রথমবারের মত যারা ঝালকাঠিতে বেড়াতে আসেন তারা ফিরে যাওয়ার সময় একটি বা দুটি শীতলপাটি নিতে ভোলেন না। ঝালকাঠি থেকে যখন কোন উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা বদলী হয়ে যান তখন তার বিদায় অনুষ্ঠানে শীতলপাটি উপহার দেওয়ার রেওয়াজ দীর্ঘদিনের। ১৯৯৮ সালে ঝালকাঠির সিটিপার্ক দেখতে এসেছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান এবং লেখক সৈয়দ শামসুল হক তাদেরকেও ঝালকাঠিবাসীর পক্ষ থেকে শীতলপাটি উপহার দেওয়া হয়েছিল। এর পূর্বে ১৯৯৩ সালে ঝালকাঠিতে বইমেলা ও কবিতা উৎসবে অতিথি হয়ে এসেছিলেন কবি শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুন, আসাদ চৌধুরী, মোহন রায় প্রমুখ। তারাও শীতলপাটি নিয়ে যেতে ভুল করেননি।
ঝালকাঠির তৈরি শীতলপাটি পাইকারদের হাতঘুরে চলে যায় ঢাকা, সিলেট, বরিশাল ও চট্টগ্রামের বাজারে। প্রতিবছর চট্টগ্রামের লালদিঘীর পাড়ে জব্বারের বলিখেলা উপলক্ষে আয়োজিত মেলায় ঝালকাঠির হাইলাকাঠি ও ডহরশংকর গ্রামের তৈরি পাটি বিক্রি হয়।
রপ্তানিপন্য হিসেবে স্বীকৃতি না পেলেও সৌখিন ব্যবসায়ী এবং বেড়াতে আসা অতিথিদের মাধ্যমে ঝালকাঠির শীতলপাটি চলে যাচ্ছে কোলকাতা মধ্যপ্রাচ্য, বৃটেন ও আমেরিকার অনেকের বেড রুমে। অনেকে আবার নকশা করা শীতলপাটি দেয়ালে টাঙিয়ে রাখেন ড্রইংরুমের শোভা বৃদ্ধির জন্য।
ঝালকাঠি জেলার সবচেয়ে বড় শীতলপাটি তৈরির গ্রাম রাজাপুর উপজেলার হাইলাকাঠি গ্রামের পাটিকররা এখন ব্যস্ত সময় পার করছে। কারণ গ্রীস্মকালে শীতলপাটির চাহিদা থাকে প্রচুর। গ্রীস্মের এ তিনচার মাসের আয় দিয়ে তাদের চলতে হয় সারা বছর। এ গ্রাম ঘুরে শীতলপাটির কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে শীতলপাটি বোনার কৌশল, এ শিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে অনেক কিছু জানা যায়।

শীতলপাটির গ্রাম :
ঝালকাঠির শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে বিষখালী নদীর সন্নিকটে রাজাপুর উপজেলার মঠবাড়ি ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম হাইলাকাঠি। ঝালকাঠি শহরের কাঠপট্টি ট্রলারঘাট থেকে ট্রলারে উঠলে কমপক্ষে একঘন্টা পর নামিয়ে দেবে নাপিতের হাট নামকস্থানে। এখান থেকে রিকশাওয়ালাকে ২০ টাকা দিলে যাওয়া যাবে হাইলাকাঠি পাটিকরদের বাড়িতে। যাওয়ার সময় রাস্তার দুপাশে দেখা যাবে পাটি তৈরির মূল উপাদান পাইত্রার বন। এছাড়া সড়কপথে রাজাপুর হয়ে মোটরসাইকেল অথবা ভটভটিযোগে যাওয়া যায় হাইলাকাঠি। এই গ্রামে প্রায় ৫০ বিঘা জমিতে শীতলপাটি তৈরির একমাত্র কাঁচামাল পাইত্রার ক্ষেত। গ্রামের ১৫টি বাড়িতে প্রায় ৮০টি পরিবার শীতলপাটি শিল্পের সাথে জড়িত। ৬০ বছরের বৃদ্ধা থেকে শুরু করে ৮/১০ বছরের শিশু সকলেই কোন না কোনভাবে পাটি তৈরির সাথে জড়িত। প্রত্যেকেই একেকজন পাটির নিপুন কারিগর।
যুগল চন্দ্র দে নামে একজন পাটিকর বলেন, আমাদের গ্রামের প্রত্যেকেরই পাটিবন বা ক্ষেত নেই। আবার যাদের পাটিবন আছে তারাও প্রত্যেকে নিজেরা পাটি বোনেন না। অনেকে পাইত্রা বিক্রি করে দেন। অনেকে পাটিকর পাটিবনের মালিকদের কাছ থেকে পাইত্রা কিনে নেন। পোন হিসেবে (৮০টি এক পোন) একপোন পাইত্রা বেচাকেনা হয় ২০ টাকা থেকে ২০০ টাকায়। পাটিক্ষেত কিছুটা প্রাকৃতিকভাইে সৃষ্টি হয়। শুধু নির্দিষ্ট নিয়মে পাইত্রা কেটে আনতে হয়। একবার বন সৃষ্টি হলে আগাছা পরিস্কার করে তা আজীবন টিকিয়ে রাখা সম্ভব।

পাটিবোনার কৌশল :
বৈশাখ জৈষ্ঠ্যের প্রচন্ড গরমে দেহ ও মনে শীতলতা আনা শীতলপাটি তৈরির পেছনে রয়েছে হাইলাকাঠি গ্রামের একদল নারী-পুরুষে ও শিশুর দিনরাতের অক্লান্ত পরিশ্রম। হাইলাকাঠি শীতলপাটি সমবায় সমিতির সভাপতি বলাই চন্দ্র পাটিকর ও কয়েকজন বয়স্ক পাটিকরদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ক্ষেত থেকে পাইত্রা কেটে প্রথমে ছাটা হয়। তারপরে প্রতিটি পাইত্রা বাঁটি দিয়ে লম্বালম্বিভাবে তিনভাগে ভাগ করা হয় (তিনফালি) কোন সময় ৫ভাগে। এরপর ফালিগুলো একটি বড় মাটির তৈরি পাত্রে (চাড়ি/মটকি) ভাতের মাড় দিয়ে কমপক্ষে সাতদিন ভিজিয়ে রাখা হয়। তারপর আবার ভাতের মাড় ও পানিতে সেদ্ধ করা হয়। সেদ্ধ ফালি পানি দিয়ে ধুয়ে বেতি বানিয়ে (চিকন ফালি) শুরু হয় পাটি বোনা বা তৈরির কাজ। পাইত্রা দিয়ে বানানো বেতির উপরিভাগ দিয়ে তৈরি হয় মসৃণ শীতলপাটি। আর বেতির মধ্যখানের ভাগদিয়ে তৈরি হয় মোটাপাটি এবং বুকাপাটি। মোটাপাটি ও বুকাপাটির দাম শীতলপাটির চেয়ে অনেক কম।

দরদাম ও মজুরি :
৫ ফুট প্রস্থ ও ৭ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি উন্নতমানের শীতলপাটি ঝালকাঠির বাজারে বিক্রি হয় এক হাজার থেকে ১৬০০ টাকায়। মধ্যমমানের একটি শীতলপাটির দাম ৬০০ থেকে এক হাজার টাকা। এছাড়া ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা দামেও কিছু শীতলপাটি পাওয়া যায়। পাটিকরদের সাথে কথা বলে (মঞ্জু রানী) জানা গেছে, একটি শীতলপাটি তৈরি করতে একটি ছোটখাটো পরিবারের সদস্যদের ৩/৪ দিন সময় লাগে। আর একজন বয়স্ক পাটিকর একাই সাতদিনে একটি উন্নতমানের পাটি তৈরি করতে পারেন।
পাটিকরদের অভিযোগ, এতকষ্টের তৈরি শীতলপাটির দাম শুনে ক্রেতারা অনুযোগ করেন সামান্য শীতলপাটির এত দাম কেন।
গড় হিসেব করে দেখা গেছে, একটি পরিবারের যদি তিনজন লোক পাটিবোনার কাজ করেন তা হলে মাসে তারা ১০টির বেশি পাটি তৈরি করতে পারেনা। ১০টি পাটি বিক্রি করে মাসে একটি পরিবারের সর্বোচ্চ ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা আয় হয়। এই সামান্য আয় দিয়েই চলে পাটিকরদের সংসার। আমিষবিহীন খাবার খেয়ে একজন নারী পাটিকর নিপুন শিল্পীর মতো পাইত্রা থেকে আঁশ তুলে তৈরি করেন শীতলপাটি। একেকটি শীতলপাটির সাথে সাথে মিশে যায় নারীর মমতা ও তার অভাব অনটনের দুঃখ গাঁথা। ঘরের ৮-১৪ বছরের ছেলে মেয়েরাও পাটি তৈরিতে মা-বাবাকে সাহায্য করে।
ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী মৌসুমি জানায়, ‘মাঝে মধ্যে স্কুলে না যাইয়্যা পাটিবোনার কাজ করি। এইডা আমরা নিজেরা খুশি অইয়্যা করি। মা-বাবার কওনও লাগে না, তবে পরীক্ষার আগে আগে নিয়মিত স্কুলে যাই।
ফেলু চন্দ্র পাটিকর (৭০) বলেন, পুরুষনাক্রমে আমরা পাটি তৈরির কাজ করে আসছি। কত বছর পূর্বে এই কাজ শুরু হয়েছে তা জানিনা। আমাগো পোলাপান (ছেলে মেয়ে) মাঝেমধ্যে স্কুলে না যাইয়্যা আমাগো সাহায্য করে। এতে লেহাপড়ার ক্ষতি হয় ঠিকই, কিন্তু পেডেওতো ভাত দেতে অইবে।

কোথায় পাবেন :
ঝালকাঠি শহরের কাশারিপট্টিতে এক সময় ৮/১০টি পাটি বিক্রির দোকান ছিল। এখন মাত্র তিনটি দোকানে পাটি বিক্রি হয়। সবচেয়ে বড় পাটি ব্যবসায়ী গনেষ চন্দ্র পাটিকর বলেণ, রাজপুরের হাইলাকাঠি, সাংগর, নলছিটির তিমিরকাঠি, কামদেবপুর ও কাউখালীর চিড়াপাড়ার পাটিকররা আমাদের কাছে পাইকারি দরে পাটি বিক্রি করে যান। আবার নির্দিষ্ট সংখ্যায় অর্ডার দিলে তারা পাটি পৌঁছে দেন। যেকোন ক্রেতা ইচ্ছে করলে হাইলাকাঠি গ্রামে গিয়ে পাটি সংগ্রহ করতে পারেন। হাইলাকাঠি গ্রামের পাটিকররা জানান, পাইকাররা এসে প্রতিদিন পাটি কিনে শহরে নিয়ে যায়। কিছুকিছু পাটিকররা নিজেরাই লঞ্চ, ইস্টিমার, ফেরিঘাট ও শহরে গ্রামে ঘুরে পাটি বিক্রি করেন। এছাড়া আজকাল ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম থেকেও পাইকাররা আসেন পাটি কিনতে। বিভিন্ন ব্যবসায়ী কায়দা কানুন করে কোলকাতা শহরেও শীতলপাটি পাঠান বিক্রির জন্যে। বর্তমানে দেশের খ্যাতনামা কারু শিল্প প্রতিষ্ঠানে বেশ চড়া দামে শীতলপাটি বিক্রি করা হয়। আড়ং, কে-ক্রাফট, কুমুদিনী ও নিত্যউপহারে বিভিন্ন সাইজের শীতলপাটি পাওয়া যায়। এসব প্রতিষ্ঠানে দুই হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকায় প্রতিটি পাটি বিক্রি হয়।

সমস্যা ও সম্ভাবনা :
হাইলাকাঠি গ্রামের পাইত্রা বন থেকে একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রতিবছরই পাইত্রা চুরি করে কেটে নিয়ে যায়। চুরি করা পাইত্রা দিয়ে মোটাপাটি তৈরি করে বাজারে বিক্রি করা হয়। পাটিকররা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে নালিশ দিয়েও কোন প্রতিকার পাচ্ছে না।
অনিলচন্দ্র পাটিকর বলেন, পাটিশিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল অর্থনৈতিক সমস্যা। শীতলপাটি তৈরির জন্য পাটিকরদের সরকারি বা বেসরকারি কোন বানিজ্যিক ব্যাংক ঋণ দেয় না। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো ক্ষুদ্রঋণ প্রদান করলেও তার সুদের হার অত্যান্ত বেশি। পাটিকরদের দাবি সরকার যাতে শীতলপাটি রপ্তানির ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং সরকারি ব্যাংকের কৃষি ঋণ প্রদান করে।

ফেইসবুক মন্তব্য

Leave A Reply