জীবন দর্শন ভ্রমন স্বাস্থ্য ইতিহাস অনুপ্রেরণা চাকরি জানা-অজানা বিশেষ প্রতিবেদন সাক্ষাৎকার

খুমেক হাসপাতালের জরুরী বিভাগের সামনে ব্যাস্ত ফ্রি-সার্ভিস কর্মীরা; বাড়ছে চোরের উপদ্রব

0


সাইমুম মোর্শেদঃ

দুপুর বারোটা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগের সামনে জটলা পাকিয়ে স্টেচার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিছু মহিলা।কাছে গিয়ে জানা গেলো রোগী আসছে;অপেক্ষমাণ তারা। ঘড়ির কাটায় সময় গড়াতেই দেখা গেলো রোগী নিয়ে টানাহেঁচড়া চলছে, ব্যাস্ত হয়ে পড়েছেন স্টেচার হাতে সেই মহিলারা।জিজ্ঞেস করতেই মৌখিক ভাবে জানা গেলো হাসপাতালের অস্থায়ী কর্মচারীর পরিচয়।

সুচিকিৎসা প্রত্যাশী রোগীরা বলছেন, সেবা যতটা পাওয়া যায়, তার থেকে হাসপাতালের সংঘবদ্ধ এই চক্র ও হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিজনদের অভিনব কৌশলের কারণে ভোগান্তি পোহাতে হয় দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ।

স্বেচ্ছায় কাজ করা এই সকল ফ্রী সেবক অথবা সেবিকাদের নির্ধারিত কোন পোশাক বা পরিচয় পত্র নেই। অফিসের কোন তালিকায় কোন নাম পরিচয় নেই। নির্দিষ্ট কোন নিয়োগ দাতাও নেই। অথচ ওয়ার্ড মাস্টারকে টাকা দিলেই সে হাসপাতালের কর্মচারী। ফ্রি সার্ভিস হিসেবে রোগীদের পাশাপাশি পুরো হাসপাতালকেই জিম্মি করে ফেলেছে এরা। মানছেনা ডাক্তার বা সিস্টার কাউকেই।

আর বর্তমানে ফ্রি-সার্ভিস কর্মীর সংখ্যা কত তা তত্ত্বাবধায়ক বা ওয়ার্ড মাস্টার কেউই জানেন না।
এদিকে ফ্রি-সার্ভিস এর নামে বহিরাগতদের পেয়ে কোন কাজ করছে না হাসপাতালের ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা।

গাছ থেকে পড়ে আশাশুনির আব্দুল হাকিম শেখ(৪৫) খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে এলে সার্জারী ওয়ার্ডে ভর্তি করেন ইমার্জেন্সী মেডিকেল অফিসার। তাকে হাসপাতালের ট্রলিতে করে তৃতীয় তলায় নিয়ে গেলে ২০০ টাকা দাবি করেন এক ফ্রি সার্ভিস কর্মী। ১০০ টাকা দিতে চাইলে দুর্ব্যবহার শুরু করেন রোগীর সাথে। বলেন, আমরা বেতন পাই না বছরের পর বছর এগুলো দিয়ে চলি। ২০০ টাকার কমে রোগী নামাতে দেবো না। কাছে ওষুধ কেনার টাকা না থাকলেও বাধ্য হয়ে ১০০ টাকা দিয়ে হাসপাতালের বারান্দায় জায়গা হয় আব্দুল হাকিম শেখের একই দিন অর্থোপেডিক্স ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়। লাশ বের করার আগেই একশ’ টাকা দাবি করে বসেন এক মহিলা। যদিও ট্রলি নিজেরাই টেনে নিয়ে এসেছেন মৃতের স্বজনেরা। শোকে বিহব্বল হতদরিদ্র পরিবারের কাছে কোন টাকা না থাকায় লাশ নামাতেই দেয়নি এ ফ্রি সার্ভিস আয়া। পরে টাকা দিয়ে লাশ বের করেন ভুক্তভোগীরা।

অন্যদিকে, প্রতিনিয়তই খুলনা মেডিকেল কলেজে রোগী ও স্বজনদের নগদ অর্থ, মোবাইল সেট ও মূল্যবান জিনিসপত্র মুহূর্তের মধ্যে চুরি করে লাপাত্তা হচ্ছে চোরেরা।

গতকাল দুপুর একটার সময় সাতক্ষীরার মুন্সিপাড়া থেকে আগত হাসিনা বেগমের সাথে থাকা দামি মোবাইল ও নগদ দশ হাজার টাকা উধাও হয়ে যায়।দ্রুত পুলিশকে জানালেও কোন সুরাহা পায়নি হাসিনা বেগম।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, খুমেক হাসপাতালের বহিঃবিভাগ, জরুরী বিভাগ, গাইনী বিভাগ, এক্স-রে ও প্যাথলজি বিভাগের সামনে এবং বিভিন্ন ওয়ার্ডে হাসিনা বেগমের মত প্রায়ই প্রতিদিন কোথাও না কোথাও চুরির ঘটনা ঘটে। যেখানেই ভীড়, সেখানেই চোর। কতিপয় বোরখা পরিহিত অল্প ও মধ্য বয়সী মহিলা এ চুরির সাথে জড়িত। তারা প্রতিদিনই হাসপাতালে ঢুকে বিভিন্ন জনাকীর্ণ স্থানে গিয়ে কৌশলে চুরি করে। এদের সাথে হাসপাতালের কতিপয় কর্মচারীর যোগসাজসও রয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন।

হাসপাতালের ভুক্তভোগী রোগীরা বলছে এর চেয়ে বড় নৈরাজ্য আর হয় না। গায়ে হাত তুলে টাকা নেয় এরা।
জরুরী বিভাগ, বিভিন্ন ওয়ার্ড আর বহির্বিভাগে প্রতিদিন এ ধরনের অন্তত অর্ধশত ঘটনা ঘটছে।পিরোজপুর থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর আত্বীয় আনোয়ারা বেগম বলেন, হাসপাতালে এসেই ছেলের মোবাইল চুরি হয়েছে, গত দিন আমার কাছে থাকা তিন হাজার টাকা ব্যাগ থেকে নিয়ে গেছে।আমি চিকিৎসা নিতে এসে টাকা পয়সা হারিয়ে সর্বশান্ত হয়ে গিয়েছি।এখন বাড়ি যাবার টাকাও নেই।

হাসপাতালের দায়িত্বশীল সূত্রটি জানায়, কখনো চোর ধরা পড়লে হাসপাতালের ওই সব কর্মচারীরাই এগিয়ে এসে শাস্তি দেবার অযুহাতে তাদের কৌশলে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। দালাল, ওষুধ চুরি ও ফ্রী সার্ভিস কর্মীর সম্পর্কে মিডিয়াতে নিউজ হলেও সব সময়েই সুবিধাভোগী অসাধু এই সিন্ডিকেট থেকে যায় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। কয়েকদিন অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে ধরে শাস্তি দিলেই নির্মূল করা সম্ভব বলে মনে করেন সুত্রটি।

ফেইসবুক মন্তব্য

Leave A Reply