জীবন দর্শন ভ্রমন স্বাস্থ্য ইতিহাস অনুপ্রেরণা চাকরি জানা-অজানা বিশেষ প্রতিবেদন সাক্ষাৎকার

কাক ডাকা ভোর থেকে বাপ-দাদার পেশা আঁকড়ে আছে নড়াইলের মধুমতী পাড়ের ওরা!

0


উজ্জ্বল রায়
নড়াইল প্রতিনিধি:

কাক ডাকা ভোর থেকে শুরু হয়ে কাজ চলছে গভীর রাত পর্যন্ত। তবে আধুনিকতার আগ্রাসনে এখন এ কাজে তেমন লাভ নেই। পেটের দায়ে এবং বাপ-দাদার দীর্ঘদিনের পেশাকে টিকিয়ে রাখতে এখনও এ কাজকে আঁকড়ে ধরে আছে তারা। সারা দেশে কুমার শিল্প বিলীন হতে চললেও নড়াইলের উপজেলার কুমারডাঙ্গা গ্রামের চিত্র ব্যতিক্রম। এ গ্রামের কুমাররা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন হরেক রকম মাটির জিনিস তৈরির কাজে। এসব কাজ পুরুষের পাশাপাশি করছেন পরিবারের নারী ও শিশুরাও। কাক ডাকা ভোর থেকে শুরু হয়ে কাজ চলছে গভীর রাত পর্যন্ত। তবে আধুনিকতার আগ্রাসনে এখন এ কাজে তেমন লাভ নেই। পেটের দায়ে এবং বাপ-দাদার দীর্ঘদিনের পেশাকে টিকিয়ে রাখতে এখনও এ কাজকে আঁকড়ে ধরে আছে তারা।

নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার মধুমতী পাড়ের কুমারডাঙ্গা গ্রাম। এ গ্রামে মৃৎ শিল্পের ইতিহাস শত বছরের। এখানকার কুমারদের সুনিপুন হাতে তৈরি মাটির জিনিসপত্রের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে নড়াইল ছাড়াও কয়েকটি জেলায়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, বাগেরহাট ও খুলনা জেলার হাটবাজারেও বিক্রি হচ্ছে এখানকার তৈরি জিনিসপত্র। কালের বিবর্তনে মাটির তৈরী হাড়ি পাতিলের চাহিদা কমতে থাকে। তার জায়গা দখল করে নেয় অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিক-মেলামাইন সামগ্রী। এক সময়ের রান্নাঘরের হাড়ি, কড়াই, বদনা, ঢাকুন, ফুলের টব, কলস, ঠিলে, পিঠার ছাচ, মুড়ি ভাজার সামগ্রী তৈরী করে গৃহস্থালীর চাহিদা মেটানো সেই সব কুমারদের অধিকাংশেরই চাকা (মাটির সামগ্রী তৈরী করা যন্ত্র) বন্ধ হয়ে গেলেও লোহাগড়া উপজেলার কুমারডাঙ্গা গ্রামে তা সচল রয়েছে। এই গ্রামে মোট ৭৮টি পরিবারের মধ্যে কুমার পরিবারের সংখ্যা ৩২। এসব পরিবারের দেড় শতাধিক সদস্য এখনও মাটির তৈরি জিনিসপত্র নিজ হাতে বানিয়ে বাজারে বিক্রয় করে সংসার চালায়। তবে প্লাস্টিকের তৈরি আধুনিক জিনিসপত্রের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কদর কমেছে মাটির তৈরি জিনিস পত্রের। তাই বেকার হয়ে পড়েছে মাটির কারিগররা। এরই মধ্যে জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের কুমারেরা অনেকেই পেশা পরিবর্তন করে ফেলেছে। এখন তাদের কেউ ভ্যান রিক্সা, কেউ মাটি কাটা ইত্যাদি দিন মজুরের কাজ করছে। তবে অনেকেই বাপ-দাদার পেশাকে ধরে রেখেছেন।

সরেজমিনে কুমারডাঙ্গা গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, এ গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে দিনরাত ঘুরছে কুমারের চাকা। কেউ মাটিতে পানি মিশিয়ে কাঁদা নরম করছে, কেউ মাটির তৈরী জিনিস রোদে শুকানোর কাজ করছে, কেউ ব্যস্ত এসব পোড়ানোর কাজে। আবার অনেকের মনোযোগ পোড়ানো জিনিসপত্রে রং-তুলির কাজে। এ বিষয়ে কুমারডাঙ্গা গ্রামের অরবিন্দু পাল, নড়াইল জেলা অনলাইন মিডিয়া ক্লাবের সভাপতি উজ্জ্বল রায়কে জানান, মাঘ মাসের শুরু থেকেই তাদের কাজ শুরু হয়। চৈত্র-বৈশাখ এ দুমাসে রোদের তেজ বেশি থাকায় তখন কাজ আরও বেশি হয়। ওই গ্রামের অর্চনা পাল বলেন, ত্রখন কাজের খুব চাপ। তাই স্বামীর কাজে তিনি সহযোগিতা করেন।

পঞ্চনন পাল অভিযোগ করে কন্ঠ ৭১-কে জানান, এ পেশায় এখন আর লাভ নেই। অন্য কোনো কাজ জানি না তাই বাপ-দাদার পেশাকে কোনো আঁকড়ে ধরে আছি মাত্র। অনীল পাল জানান, নতুন কেউ এ কাজ শিখছে না, তাই আগামীতে কুমারের চাকা ঘোরোনোর মত কেউ থাকবে না। বর্তমানে প্লাস্টিক ও সিলভার আসায় মাটির তৈরী জিনিসের দাম কমে গেছে। জেলায় কুমার পরিবার ও তাদের সংখ্যার সুর্নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে লিপিবদ্ধ নেই। সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো পৃষ্ঠপোষকতাও নেই এ শিল্পে। এমনটি চলতে থাকলে অচিরেই সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে মৃৎ শিল্পের। এজন্য এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন জেলার সচেতন মহল।

ফেইসবুক মন্তব্য

Leave A Reply