জীবন দর্শন ভ্রমন স্বাস্থ্য ইতিহাস অনুপ্রেরণা চাকরি জানা-অজানা বিশেষ প্রতিবেদন সাক্ষাৎকার

একজন বীরাঙ্গনার গল্প …..

0

একজন বীরাঙ্গনার গল্প

১৯৭১ সাল!! আমি তখন নবম শ্রেণীর ছাত্রী! ফ্রক ছেড়ে সবে শাড়ি পরছি! বাবা আদর করে ডাকতেন মালতী বলে!! দাদা সদ্য কলেজ শেষ করে গেরিলা ট্রেনিং এ যোগ দিয়েছে! বাবা আমাদের মফস্বলের ই একটা বয়েজ স্কুলের হেডমাষ্টার! তারিখ টা ছিলো ২৭শে এপ্রিল, ভর সন্ধ্যায় একটি জীপ এসে থামলো আমাদের বাড়ির সামনে !!

জীপ এ বেশ কয়েক জন পাকিস্তানি জোয়ান বসা, সামনের সিটে বসা সুদর্শন অফিসারটি বাবাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে আমাকে টানতে টানতে জীপে তুলল!! মা বাবার বুকফাটা চিৎকার উপেক্ষা করে জীপ ছুটে চলল আমাকে নিয়ে!!

ওরা ততক্ষনে আমার হাত, মুখ ,চোখ বেঁধে ফেলেছে!! ভেবে নিলাম হয়তো মেরে ফেলবে! মনে মনে “জয় বাংলা ” বলে প্রস্তুতি ও নিয়ে ফেললাম! ভয় কি? মরব তো দেশের জন্যই…একটা সময় হঠাৎ জীপ থেমে গেল, ওরা আমার চোখ খুলে দিলো! নিয়ে আসা হলো একটি পুরনো বাড়িতে! আমাকে ধাক্কা দিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দিলো, ভেতরে আমারি বয়সী কিংবা আমার থেকে বয়সে বড় আরোও কয়েক জন নারী! ! আমাকে দেখে কে যেন বিলাপ করে উঠলো!!

তারপর এলো সেই অভিশপ্ত রাত!
জীপে দেখা সেই সুদর্শন জোয়ান আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল পাশের ঘরে!! তারপর…..ঠিক মনে নেই! ! শুধু মনে আছে লালসা ভরা এক জানোয়ার এর হিংস্র থাবায় ছিন্ন বিছিন্ন হওয়া আমার গগন বিদারী চিৎকার! সেই রাতে কতজন পশু আমার উপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছিলো ঠিক মনে নেই!! ৮-১০ জন তো হবেই শেষের দিকে চিৎকার করার ক্ষমতা ও হারিয়ে ফেলেছিলাম!! রক্তে ভেসে যাচ্ছিলাম!! শুধু শরীরের শেষ শক্তিটুকু জড়ো করে বিড় বিড় করে বলছিলাম ….
“জয় বাংলা”…..” জয় বাংলা”!! তারপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলি!!

এইভাবে দীর্ঘ ৮ মাস চলেছিল আমাদের উপর নির্যাতন!! মাঝে মাঝে ইচ্ছে হতো মরে যাই ….কিন্তু কি করে???
পাশের নির্যাতন সেলে একটি মেয়ে শাড়ি দিয়ে গলায় ফাঁস দেয়!! তাই ওরা আমাদের শাড়ি ও পরতে দিতো না!! উলংগ …..নোংরা ….পশুর জীবন!!

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি তে আমাদের যখন উদ্ধার করে শরনার্থী শিবিরে নিয়ে আসা হয়। তখন আমি মানসিক ভারসাম্যহীন!! ডাক্তারদের সেবায় আমি যখন সুস্থ হই….তখন একদিন বাবা এলেন আমায় দেখতে!! আমি বাবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বুকফাঁটা কান্নায় ভেঙে পড়ি!! বলি “বাবা তুমি আমায় বাড়ি নিয়ে চলো” ….বাবা আমতা আমতা করে বল্লেন….বাড়ি এখনো মেরামত হয়নি তো …তোকে পরের বার নিয়ে যাব!! আমি ততক্ষনে ঠিক বুঝে গেছি নিজের অবস্থান!! আমি কুলহারা কলঙ্কিনী!! আমার কোথাও স্থান নেই!! আস্তে আস্তে বাবার বুক থেকে সরে আসি!! চিরদিনের জন্য!!

এর কিছুদিন পরই বঙ্গবন্ধু আমাদের
উপাধি দেয় “বীরাঙ্গনা”!!

শুনে যাও ১৬ কোটি মানুষ ….আমি
কলঙ্কিনী নই ….আমি “বীরাঙ্গনা”!!
এ আমার লজ্জা নয়….এ আমার অহংকার! !!

(সকল বীরাঙ্গনার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা)

….সংগৃহীত

ফেইসবুক মন্তব্য

Leave A Reply